B-56#সুলেমান ও সঞ্চারী (শুভ সুমেধার দ্বাদশ অধ্যায়)

সুলেমান ও সঞ্চারী (শুভ সুমেধার দ্বাদশ অধ্যায়)
 ন কাকিমা আজ  এই প্রথম গল্প লিখছি, শুভর ছোটবেলাকার একেবারে বাল্যকালের বন্ধু সুলেমানের কাহিনী। পড়ে দেখো তো ঠিক হয়েছে নাকি লেখাটা? তবেই আমি ব্লগে দেবো, এই প্রথম আমার লেখা, তাই তোমায় না দেখিয়ে  পোষ্ট করবো না। সুলেমান আজ আর নেই, গতবছর সে এই দুনিয়া থেকে ছেড়ে চলে গেছে।
                 শুভ এই শুভ,(খুব গভীর রাতে  জানালায় ঠক ঠক শব্দ আর ফিস ফিস গলার স্বর) জানালাটা খুলবি, এখন রাত সাড়ে তিনটে বাজে,  একটা জরুরি কথা আছে, জানালাটা খুলবি? খোল না রে আমি দেখ খুব দরকার তাই এসেছি, একটা উপকার করতে হবে, একটা জিনিস নিয়ে এসেছি তোকে দেবো বলে, আসলে তোর মারফৎ পাঠাবো বলে, খোল না শুভ, দেখ ভোর হয়ে গেছে, রাস্তায় লোকজন হাঁটতে বেরিয়ে গেছে।
ওরে মা রে, কাকু আমি চোর নই কেন ঢিল টা মারছেন। আরে আমি আমার বন্ধুকে জানালা দিয়ে ডাকতে এসেছি, হাঁটতে যাবো বলে। এই যে মশায় শুনুন কি ভেবেছেন টা কি আধলা ইটটা ছুঁড়ে পায়ে মারলেন। কি বে শালা উঠবি নাকি আমায় যে মারছে ওরা ওঠ আমায় বাঁচা। আমি হাঁটতে পারছি না উফফ ।
              কি রে এতো রাতে চেঁচাচ্ছিস কেন, কি হয়েছে? কে তোর গায়ে হাত দিয়েছে। দেখি তো কোন বাপের ব্যাটা আছে তোকে চোর বলে মেরেছে, এই কে আছিস  দম থাকলে সামনে আয়, যাই হোক তাবলে ছেলেটাকে এভাবে চোর ভেবে পাথর ছুঁড়ে মারবে ।আরে চ্যাটার্জী কাকু, কিছু মনে কোরো না একটু ভুল হয়ে গেছে বাজে কথা বলে ফেললাম তোমায়, আরে ও আমার বন্ধু সুলেমান, চলো চলো হাসপাতালে নিতে হবে যে, পা টা কেটেও তো রক্ত বেরোচ্ছে।
      বাবা: এ তো স্টিচ করতে হবে, কি করে হোলো, দেখুন পায়ের যা অবস্থা একটা x ray করতে হবে চোট টাও মারাত্মক বেশি মনে হচ্ছে ভেঙেছে ভালোই, যাক ব্যাথা কম হওয়ার ওষুধ দিলাম, পারলে আজকের মধ্যেই রিপোর্টটা দেখবেন, প্লাস্টার করতে হবে।
       আচ্ছা গুরু, সুল্লু,কোনোদিন ও তো আসিস নি এতো ভোরে, আজ কি হোলো তুই, বলা নেই কওয়া নেই ভোর রাতে তোর আসতে হোলো? কি বলবি কিছু নাকি ব্যাথার জন্য পারছিস না।
      বলছি দাঁড়া রিকশাটাকে একটু আসতে চালাতে বল, চাকা গর্তে পড়লে আরো ব্যাথা করছে। শোন্ না শুভ আব্বা খুব মারবে বাড়ির মেইন দরজার চাবি আমার কাছে, আব্বা তো সকালে হাঁটতে বেরোবেন, ভেবেছিলাম তোকে এই চিঠিটা দিয়েই বাড়িতে ঢুকে যাবো, এমনিতেই সারারাত ঘুমোয়নি চিঠিটা লিখছিলাম বলে। শুভ তুই একটু সামলে দে ভাই আমার সাথে বাড়িতে চল। উফফ পা টা নড়াতেই পারছি না মোটা হয়ে ফুলে গেছে, গেলো পা টা, আজ কাকে দেখে দিনটা শুরু হোলো, তুই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলে এতো সমস্যা হতো না।
      এই শোন্ সুল্লু তুই কোন চিঠির কথা বলছিস রে ? ওটাই সারাটা রাত ধরে লিখেছিস আমাকে,  এমন কি চিঠি সকালে দিলে হতো না।
      ধূর তোকে কেন চিঠি দেবো, আমি তো সঞ্চারী কে মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছি, ওকে আমার দারুন লাগে,তাই ওর জন্য লেখা আমার এই চিঠি। তুই তোর দাদাকে বলবি, তোর দাদা তো অমিতদার বন্ধু, সকালে টিউশন পড়তে তো যাবে, তখন যদি কোনো ভাবে সঞ্চারীকে চিঠিটা দিয়ে দিতে পারে , তাই তো সারারাত লিখেছি, শোন্ ও কিন্তু জানে না।
 সুলেমান কোন সঞ্চারীর কথা বলছিস রে, যে উত্তরপল্লীতে থাকে সেই টেরা সঞ্চারী? 
          হ্যাঁ ঠিক ধরেছিস, সবাই ওকে টেরা সঞ্চারী বলে, কি জানি বলে না লক্ষী টেরা, তবে যাই হোক মেয়েটির হাতের লেখা দারুন, একবার একটা প্রোগ্রামে ও কবিতা পাঠ করেছিলো “ বনলতা সেন “ যা বলেছিলো আমি দর্শক আসনে সামনের সারিতে বসা, কি অসাধারণ তার বলার অর্থাৎ পাঠের দক্ষতা। সেদিন সঙ্গে আব্বা ছিলেন আব্বা তো তালি মেরেই চলেছেন সমানে, তা দেখে খুশিতে আমিও তালি মারতে থাকি। সেদিন বুঝেছিলাম আব্বার ও পছন্দ মেয়েটিকে, কিন্তু মুশকিল হোলো ওরা হিন্দু আর আমি মুসলিম। এই শুভ শোন্ তুই আমার সামনে কোনোদিন ওকে টেরা সঞ্চারী বলিস না, আমার কষ্ট হয়, যারা বলে বলুক তুই কখনোই না।
        সুলেমান শোন্ এখন সবে কলেজে পড়িস,এসব পাগলামি ছাড় পড়াশুনোয় মন দে, জানাজানি হলে কি বাজে হবে বলতো, এই তোর আঙুলে ওটা কিসের ব্যাণ্ডেজ রে?তবে মানতে হবে গুরু তুই যে একটা আস্ত পাগল, এক সঞ্চারীর জন্য সারাটা রাত জাগলি তার উপর চোরের দায়ে পা ভেঙে বসে রইলি। কি প্রেম গুরু একেবারে রোমিও জুলিয়েট ও হার মেনে যাবে।
        শোন্ না আমার বাঁ দিকের পকেটে হাত দে একটা কাগজ আছে, জানিস শুভ অনেক কষ্ট করে লিখেছি তাই তোকে দিতে এসেছিলাম, একটা সত্যি কথা বলবো হাসবি না তো, আসলে কি বলতো এর মর্ম বুঝি বলেই এতটা কষ্ট দিয়েছি, কাল না আঙুলের রক্ত দিয়ে লিখেছি শেষের ঐ তিনটে কথা “ আমি তোমাকে ভালোবাসি “। শুভ দাদাকে দিয়ে তুই সকালে পাঠাস কিন্তু চিঠিটা, দেখবি সঞ্চারী ঠিক রাজি হবে, দেখ একটু ম্যানেজ করে দে বাবাকে তুই গুছিয়ে কথা বলতে পারিস তো তাই ভরসা করি তোকে, বাবাকে বুঝিয়েই তুই বাড়ি ফিরে যা আমি আর আটকাবো না।
       দাদা, দাদা কোথায় রে দরজা খোল কি পাগলের পাল্লায় পড়েছি রে তাই হাসি চাপতে পারছি না তোকে না বলে।আরে আমার বন্ধু সুল্লু সেই  ভোর বেলায় তো এক কান্ড  এই চিঠিটা দিতে এসে, পা ভেঙে হাসপাতালে রক্তে রক্তে একাকার , আর শোন্ আরে তোর বন্ধুর বোনটা রে টেরা সঞ্চারী, ওকে  সুল্লু একটা প্রেম পত্র দিয়েছে জানিস ও বলে সারারাত আঙুলের রক্ত দিয়ে লিখেছে এই দেখ, এই কাজ তোকে করে দিতে হবে মানে সঞ্চারী কে চিঠিটা দিয়ে আসতে হবে।
      ভাই শোন্ এসব ছেলেমানুষি ওকে করতে না কর, আমি পারবো না। কই দেখি চিঠিটা কোথায় রক্ত দিয়ে লিখেছে? আচ্ছা বুঝলাম। শোন্ ভাই একটু কাপে করে জল নিয়ে আয়  তো? দেখ কি করছি।
     একি দাদা কি করছিস, ও জানতে পারলে তো কেলেঙ্কারি কান্ড হবে,  যা তুই এটা ভালো করলি না আমি কি বলি বলতো ওকে, যদিও আমারও হাসি পাচ্ছে।তুই তাহলে দিতে পারবি না তাইতো, আর এটাই বা ওকে দেখাই কি করে?
    ভাই শোন্ তুই শিগগির যা গিয়ে বল তোর রক্তে লেখা চিটিটাতে ঘামে, পিঁপড়েতে একেবারে ল্যাপ্টালেপ্টি কেস কিছুই বোঝা যাচ্ছে না বিশেষ করে ঐ তিনটে কথা তো একে উপরের উপর জড়িয়ে রক্তে আঠা হয়ে গেছে, প্রথমে দাদা তো খুলতেই পারছিলো না, অনেক কষ্টে খুলেছে সঞ্চারী খুললে তুই প্রেম তো দূরের কথা ঝাঁটা পেটা খাবি । শোন্ তুই তোর পা টা আগে ঠিক কর পরে দেখা যাবে ক্ষণ। আমি কথা দিচ্ছি আমি তোর এ প্রেমের জন্য এগোতে সাহায্য করবো বুঝলি রোমিও।
এতিমধেই সঞ্চারীর কাছে খবর পৌঁছয় বন্ধুবান্ধব মারফৎ যে সুলেমানের এক্সিডেন্ট হয়েছে সে পা ভেঙে পড়ে আছে, আর সুলেমান সঞ্চারীকে বেশ চায়, অর্থাৎ মনে তাকে স্থান দিয়েছে।সঞ্চারী ও হয়তো মনেমনে সে খবর পেয়ে সুলেমানকে চাইতে শুরু করেছে। মনের মধ্যে বাধা একটাই ও মুসলিম আর সঞ্চারী হিন্দু। দিন যায় সুলেমানকে আর দেখা যায়না এদিকে সঞ্চারী ও উতলা। প্রায় মাসখানেক হয়ে গেছে একদিন সুলেমান আবার তার বন্ধু মারফৎ খবর পাঠায় আজ সে বের হবে। সুলেমান ও বের হয়। দূর থেকে সুলেমান দেখে বাজার  থেকে সঞ্চারী ফিরছে। কাছে আসতেই সুলেমান একটু থমকে দাঁড়িয়ে সঞ্চারীর দিকে এমন ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতে থাকে একটা করুনা, নিজের প্রতি মায়া সঞ্চারীকে একেবারে গলিয়ে প্রেমের সে কাতর বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
যাক তাদের সে বিয়ে হয় শর্ত একটাই সঞ্চারী তার পদবী আর ধর্ম পাল্টায়নি। সুলেমান ও তাকে বাধ্য করেনি। শুভর দাদা তো ওদের বিয়ে শুনে অবাক শেষে না পেরে বলেই বসলো যাক তাহলে  “ টেরা সঞ্চারী ও ল্যাংড়া সুলেমান “ সাত পাকে বাঁধা পড়লো, কি ভাই তাই না, সুল্লু টা খেটেছিলো খুব এবিয়ে নিয়ে।
সুলেমান নেই মারা গেছে ক্যান্সার এ। আজ শুভ একটা পুরোনো কথা খোলসা করবে সঞ্চারীর কাছে যা সঞ্চারীর আজও অজানা। সুলেমানের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল বহু আগেই ডক্টর বলেছিলেন আঙ্গুল টা বাদ দিলে তাকে হয়তো বাঁচানো যেত। সেকথা একমাত্র শুভ জানে আজ থেকে বহু বছর আগে এই আঙুলেই সে প্রথম ছুঁচ ফুটিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে ছিল সে প্রেমপত্র যা সঞ্চারী কোনোদিন জানতে পারেনি। তাই সে ভালোবাসার প্রমান রেখে দিল একেবারে নিশ্চুপে শুভর কাছে।


Comments

sadamata101.blogspot.com

B-9 # subhendu sir(শুভেন্দু স্যার)

B-8 #REUNION (রিইউনিয়ন) 1985 GHATSILA

B-121# পশ্চাতাপ